নতুন সিনেপ্লেক্স নির্মাণে আশা জাগছে, কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্প কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াবে?
- Update Time : ০৬:৪৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / 7
দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে দীর্ঘদিনের ধীরগতির মধ্যে নতুন করে কিছুটা আশা তৈরি করেছে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের পরিকল্পনা। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে তথ্য কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু শুধু নতুন ভবন ও আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করলেই কি শিল্পের সংকট দূর হবে? দর্শক কি আবার হলে ফিরবেন, বিনিয়োগকারীরা কি আস্থা ফিরে পাবেন এবং সেই হলগুলোতে সারা বছর নতুন সিনেমা চলবে কি না—এসব প্রশ্ন এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও অভিনেতা পারভেজ আবীর চৌধুরী মনে করেন, শুধু হল নির্মাণ করে চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বক্স অফিস ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আয় বণ্টন, মানসম্পন্ন সিনেমা তৈরি এবং দেশের বাইরে বাজার সম্প্রসারণের বাস্তবসম্মত কাঠামো। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন।
একসময় নতুন সিনেমা মুক্তির দিনে প্রেক্ষাগৃহের সামনে দর্শকের দীর্ঘ লাইন দেখা যেত। টিকিট পাওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত। একের পর এক হল বন্ধ হয়ে গেছে। দর্শকের বিনোদনের অভ্যাসও বদলে গেছে। ঘরে বসেই এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কনটেন্ট উপভোগ করা যায়। ফলে সিনেমা হলকে টিকিয়ে রাখা এখন শুধু নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন হল নির্মাণ প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে দর্শক ফেরানোর কার্যকর পরিকল্পনাও জরুরি।
পারভেজ আবীর চৌধুরীর মতে, একটি হল তৈরি করতে ভবন, চেয়ার, পর্দা বা উন্নত সাউন্ড সিস্টেম যোগ করা সম্ভব। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই পর্দায় নিয়মিত কী দেখানো হবে?
চলচ্চিত্র নির্মাণ এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি মানসম্পন্ন সিনেমায় কয়েক কোটি টাকা খরচ হওয়া স্বাভাবিক। সেই অর্থ বিনিয়োগ করে প্রযোজক যখন ছবি তৈরি করেন, তখন তাঁর প্রধান প্রত্যাশা থাকে স্বচ্ছ হিসাব এবং ন্যায্য আয় পাওয়া। কিন্তু মুক্তির পর টিকিট বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ কত, প্রযোজকের অংশ কত, হল মালিক বা পরিবেশকের প্রাপ্য কত—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ কারণেই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল বক্স অফিস ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। দেশের যেকোনো প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমার কত টাকার টিকিট বিক্রি হলো, সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট সবাই সহজে জানতে পারলে চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক কাঠামো অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে। প্রথম সিনেমায় বড় ক্ষতি হওয়ার পর কোনো প্রযোজক যদি পরবর্তী সিনেমায় বিনিয়োগ করতে সাহস না পান, তাহলে নতুন হল নির্মাণ করেও লাভ কী?

বর্তমানে একটি সিনেমার আয়ের সম্ভাবনা শুধু প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ নয়। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ডিজিটাল মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশনার মাধ্যমে একটি সিনেমা দেশের সীমানা পেরিয়ে আরও বড় দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে নিয়মিতভাবে বাংলা সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বাজারকে এখনো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়নি। পারভেজ আবীর চৌধুরীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক দায়িত্বের জায়গা থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের গান, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। তাদের কাছে নিয়মিত ও বৈধ উপায়ে বাংলাদেশের সিনেমা পৌঁছে দিতে পারলে চলচ্চিত্রের জন্য নতুন একটি বাজার তৈরি হতে পারে। দেশের বাজার ছোট—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বসে থাকার পরিবর্তে বাংলা সিনেমার বাজারকে ভৌগোলিকভাবে আরও বড় করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় হুমকি হলো পাইরেসি। একটি সিনেমা মুক্তির পর অল্প সময়ের মধ্যেই যদি সেটি অবৈধভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে প্রেক্ষাগৃহের দর্শক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রযোজকও। এর প্রভাব শুধু একটি সিনেমায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একবার ক্ষতিগ্রস্ত প্রযোজক ভবিষ্যতে নতুন সিনেমায় অর্থ লগ্নি করতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিল্প। তাই চলচ্চিত্রের উন্নয়নের সঙ্গে পাইরেসি নিয়ন্ত্রণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
চলচ্চিত্রের সংকট কোনো একক পক্ষের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার, প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, পরিবেশক এবং হল মালিক—সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পারভেজ আবীর চৌধুরী তাই ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প সুরক্ষা ও উন্নয়ন রোডম্যাপ’-এর মতো একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। যেখানে স্বচ্ছ বক্স অফিস, ন্যায্য আয় বণ্টন, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ, চলচ্চিত্রে অর্থায়নের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা সিনেমার প্রবেশ—সব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন প্রযোজক একটি সিনেমা শেষ করার পর পরবর্তী সিনেমার পরিকল্পনা করার সাহস পান।
চলচ্চিত্রের সুদিন শুধু কতটি নতুন হল নির্মাণ হলো, সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে—সেই হলের পর্দায় নিয়মিত ভালো সিনেমা আছে কি না, দর্শক সেখানে ফিরছেন কি না এবং নতুন সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রযোজকের আস্থা তৈরি হয়েছে কি না। ইট-কংক্রিট দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তিও যুক্ত করা যায়। কিন্তু একটি সচল চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজন গল্প, নির্মাতা, শিল্পী, বিনিয়োগকারী এবং দর্শকের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক।
নতুন হল তাই আশার খবর। তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নতুন প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি নতুন সিনেমা তৈরির পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। বক্স অফিসে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগে নিরাপত্তা, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু নতুন হল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—নতুন সেই হলের পর্দায় নিয়মিত সিনেমা থাকবে কি না। আর সেই সিনেমা তৈরির জন্য প্রযোজকরা আস্থা নিয়ে আবার বিনিয়োগের টেবিলে ফিরবেন কি না। চলচ্চিত্র বাঁচাতে তাই শুধু হল নয়, পুরো ব্যবস্থাটাকেই নতুন করে সাজানোর সময় এসেছে।














